হাজার দুয়ারী রাজ প্রসাদের ইতিহাস

[caption id="attachment_946" align="alignright" width="300"]হাজার দুয়ারী প্রাসাদ হাজার দুয়ারী প্রাসাদ[/caption]

মুর্শিদাবাদ বাংলার নবাবদের রাজধানী । মুঘলদের অধীনে যত দিন বাংলা ছিল - বাংলার রাজধানী ছিল ঢাকা, মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব এর শাসনের প্রায় শেষের দিকে সম্রাট করতলব খাঁ নামক এক ব্যাক্তিকে বাংলার সুবেদার হিসাবে নিযুক্ত করেন- যিনি মুর্শিদ কুলি খান নামে সর্বাধিক পরিচিত – যাই হোক করতলব খা এর সততা এবং দক্ষতা সম্রাটকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি করতলব খাঁকে ভাগীরথী গঙ্গার তীরে মকসুদাবাদে তার রাজধানী সরানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে ‘মুর্শিদকুলি খাঁ’ উপাধি প্রধান করেছিলেন সম্রাট ঔরঙ্গজেব,এবং মকসুদাবাদের নাম পাল্টে মুর্শিদাবাদ করার অনুমতিও তাকে দেওয়া হয় । ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর বেশ কিছু বছর পর ১৭১৭ সালের দিকে মুর্শিদ কুলি খান ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী সরিয়ে আনেন। এবং বাংলায় নিজের অবস্থান পোক্ত করেন- এইদিকে নানান জটিলতায় পড়ে দিল্লির মুঘল রাজশক্তি তখন ক্রমশ ক্ষয় পাচ্ছে, সেই সুযোগে মুর্শিদ কুলী খান প্রায় স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করতেন। যার পরিক্রমায় তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার প্রথম নবাব।


তারপর ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল প্রবাহিত হয়েছে। ক্ষমতার পালা বদলে বাংলার মসনদে বসেছেন সুজাউদ্দিন, সরফরাজ খাঁ, আলিবর্দি খা এবং শেষ এ হতভাগ্যের শিরমনী নবাব সিরাজ উদ্দ দৌলা- এর পরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি- গর্ধবের শিরমনী - সিরাজকে পরাজিত করে ১৭৫৭ সালে বাংলার দখল ন্যায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। মিরজাফর হয় নতুন নবাব। তারপর এলেন মিরজাফরের জামাতা মিরকাশিম, তারপর আবার মিরজাফর। ততদিনে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা পুরোপুরি ব্রিটিশদের দখলে চলে গেছে। একের পর এক পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে মুর্শিদাবাদ। সেই জীবন্ত সাক্ষীকে চাক্ষুস দেখতে আজ পর্যটকরা মুর্শিদাবাদে ভিড় জমান।


মুর্শিদাবাদের দর্শনীয় স্থানগুলির তালিকায় মধ্যে পর্যটকরা সবার অগ্রভাগে রাখেন হাজারদুয়ারি প্রাসাদকে। এই দুর্গপ্রাসাদ যেখানে অবস্থিত, সেই পুরো চত্বরকে নিজামত কিলা বা কিলা নিজামত নামে ডাকা হয়। হাজারদুয়ারি ছাড়াও ইমামবাড়া, ঘড়ি ঘর, মদিনা মসজিদ, চক মসজিদের মতো বেশ কিছু স্থাপত্য রয়েছে এই কিলা নিজামত এলাকায়। অনেকে মনে করেন, হাজারদুয়ারি প্রাসাদের নির্মাণ কাজ প্রথম শুরু করিয়েছিলেন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। কিন্তু এটি একেবারেই ভুল ধারণা বলে পড়ে প্রমান হয়- কারন সিরাজের প্রাসাদ ছিল হিরাঝিল। আর এখন তা ভাগীরথীর গর্ভে বিলীন তার ছিটে ফোটাও নেই –



১৮২৯ সালে নবাব নাজিম হুমায়ুন ঝা তৈরি করিয়েছিলেন হাজারদুয়ারি প্রাসাদ। ১৮২৯ সালে তিনি এই হাজার দুয়ারী প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গোটা স্থাপত্যের রূপকার ছিলেন ইংরেজ স্থপতি ডানকান ম্যাকলিওড। দেখলেই বুঝবেন, এই হাজার দুয়ারী রাজ প্রাসাদের স্থাপত্যশৈলী ইউরোপীয় ঘরানার, বিশেষ করে ইতালীয় রীতির সৌধগুলোর সঙ্গে প্রচুর মিল রয়েছে । ১৮২৯ সালে শুরু হয়ে ১৮৩৭ সালে মুর্শিদাবাদের প্রধান আকর্ষণ হাজারদুয়ারির নির্মাণকার্য শেষ হয়-


৪১ একর জায়গার উপর এই প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে। ১ হাজারটা দরজা আছে বলে এর নাম দেওয়া হয় হাজারদুয়ারি। অবশ্য দরজাগুলির মধ্যে প্রায় ১০০টাই নকল। তবে চট করে দেখে নকল দরজাগুলোকে চিহ্নিত করতে বেশ ধন্ধে পরতে হবে- দেওয়ালের মধ্যে এই নকল দরজা গুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, বাইরে থেকে দেখলে হুবহু একে আসল দরজা মনে হবে। দুর্গপ্রাসাদে যদি হঠাৎ করে শত্রুরা আক্রমণ করে বসে, তবে তাদের বিভ্রান্ত করার জন্যই তখন এই নকল দরজাগুলো বানানো হয়েছিল। সাধারণভাবে প্রাসাদটি হাজারদুয়ারি নামে প্রচলিত হলেও,এর নির্মাতা নবাব হুমায়ুন জা একে ‘বড়ো কুঠি’ নামেই ডাকতেন।

Comments